চট্টগ্রাম এর 10টি দর্শনীয় স্থান

 

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত

পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত (Patenga Sea Beach) বাংলাদেশের সুন্দর জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকতগুলোর মধ্যে অন্যতম। চট্টগ্রাম থেকে মাত্র ১৪ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত এই সমুদ্র সৈকতে সহজেই যাওয়া যায় বলে পর্যটকদের কাছে জনপ্রিয়তা দিন দিন বাড়ছেই। এছাড়া এই সৈকতকে আরও আকর্ষণীয় করে তোলার জন্যে বেশ কিছু পরিকল্পণা বাস্তবায়িত হচ্ছে। কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের পতেঙ্গা সৈকতকে আধুনিক বিশ্বমানের পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ চলছে। ইতিমধ্যে সম্পন্ন হওয়া দৃষ্টিনন্দন সাজসজ্জা নজর কেড়েছে সবাইকে।

কর্ণফুলী নদী সাগরের মোহনায় অবস্থিত পতেঙ্গায় সূর্যোদয় কিংবা সূর্যাস্তের দৃশ্য খুবই মনোরম। বিশেষ করে বিকেল, সূর্যাস্ত সন্ধ্যার সময়টুকু অবশ্যই ভাল লাগবে। চট্টগ্রাম বন্দরের জন্যে অপেক্ষমান সারি সারি ছোট বড় জাহাজ এইখানের পরিবেশে ভিন্নতা নিয়ে আসে। পতেঙ্গায় রয়েছে স্পীড-বোটে চড়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়ানোর সুযোগ রয়েছে। সমুদ্র তীরে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে আছে সী বাইক ঘোড়া। কেনাকাটার জন্যে আছে বার্মিজ মার্কেট। খাওয়া দাওয়ার জন্যে আছে হরেক রকক মজাদার স্ট্রিট ফুড।পতেঙ্গা বিচের কাছেই রয়েছে শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর, বাংলাদেশ নৌ বাহিনীর ঘাটি, চট্টগ্রাম বন্দরের অনেক জেটি এবং প্রজাপতি পার্ক। এইসব গুলো জায়গা কাছাকাছি হওয়ায় ঘুরে দেখতে পারবেন একসাথেই। বন্ধু বান্ধব কিংবা পরিবার পরিজন নিয়ে সুন্দর সময় কাটানোর জন্যে চট্টগ্রাম জেলার এই পতেঙ্গা সৈকত আসলেই এক সুন্দর স্থান

চন্দ্রনাথ পাহাড় মন্দির

চন্দ্রনাথ পাহাড় (Chandranath Hill) হিন্দু ধর্মালম্বীদের তীর্থস্থান আর সুবিশাল সমুদ্র অপরূপ প্রাকৃতিক সৌর্ন্দয্যের লীলাভূমি সীতাকুণ্ডকে করেছে অনন্য। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের অবস্থান সীতাকুণ্ড বাজার থেকে মাত্র কিলোমিটার পূর্বে দিকে। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে পায়ে হেঁটে কিংবা রিক্সায় করে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে নিচের গেটের কাছে যাওয়া যায়। তবে পায়ে হেঁটে চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবার পথে হিন্দুদের বেশ কিছু ধর্মীয় স্থাপনা অধিবাসীদের জীবন যাত্রার চিত্র দেখে যেতে পারবেন। এছাড়াও পাহাড়ের একটু গভীরে গেলে চোখে পড়বে জুমক্ষেত এবং বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চাষ করা ফুলের বাগান। চন্দ্রনাথ পাহাড় চূড়াতেই চন্দ্রনাথ মন্দির (Chandranath Temple) অবস্থিত।

চন্দ্রনাথ পাহাড়ে যাবার পথে ছোট একটি ঝর্ণা দেখাঁ যায়। এই ঝর্ণার কাছ থেকে পাহাড়ে উঠার পথ দুই দিকে চলে গেছে। ডান দিকের পথটির পুরোটাতেই পাহাড়ে উঠার জন্য সিঁড়ি তৈরি করা আর বাম পাশের পথটি সম্পূর্নই পাহাড়ি। সাধারণত পাহাড়ি পথ দিয়ে উপরে উঠা তুলনামুলক সহজ আর সিঁড়ির পথে নামাতে সহজ হয়। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উচ্চতা ১১৫২ ফুট। হেঁটে উঠতে একটু পরিশ্রমের কাজ হলেও আপনার হাঁটার উপর নির্ভর করবে কতক্ষণ লাগবে। সাধারণত ঘন্টা ৩০ মিনিটের মত সময় লাগবে আসতে ধীরে উঠলে। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের উপরেই চন্দ্রনাথ মন্দির অবস্থিত। চন্দ্রনাথ পাহাড়ের মাঝামাঝি দূরত্বে এবং চূড়ায় মন্দিরের কাছে ছোট টং দোকান আছে সেগুলিতে হালকা খাবার এবং পূজা দেয়ার উপকরণ পাওয়া যায়, তবে ভালো হয় উঠার সময় সাথে পর্যাপ্ত পানি কিছু শুকনো খাবার সাথে রাখলে। প্রতি বছর মহাশিবরাত্রি উপলক্ষ্যে প্রচুর হিন্দুধর্মালম্বী চন্দ্রনাথ পাহাড় মন্দিরে পুণ্যযাত্রায় আসেন।

মহামায়া লেক

মহামায়া লেক (Mohamaya Lake) চট্রগ্রামের মিরসরাইয়ে অবস্থিত বাংলাদেশের অন্যতম কৃত্রিম হৃদ। মিরসরাইয়ের দুর্গাপুর ইউনিয়নের ঠাকুরদিঘী বাজার থেকে মাত্র দুই কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের কোলে ১১ বর্গ কিলোমিটার জায়গাজুড়ে মহামায়া লেক গড়ে উঠেছে। লেকের টলটলে পানি আর পাহাড়ের মিতালী ছাড়াও এখানে পাহাড়ি গুহা, রাবার ড্যাম অনিন্দ্য সুন্দর ঝর্ণা রয়েছে। বোটে চড়ে লেকে ঘুরার পাশাপাশি চাইলে পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা ঝর্ণার শীতল পানিতে ভিজে শরীর মনকে অপার্থিব প্রশান্তি দিতে পারেন। মহামায়া লেকে আছে কায়াকিং করার সুবিধা এবং চাইলে তাবুতে রাতে ক্যাম্পিং করে থাকতেও পারবেন। বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিয়ন্ত্রণে থাকা মহামায়া লেকটির পানির কিছু অংশ পার্শ্ববর্তী এলাকায় সেঁচের কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক

সীতাকুণ্ড ইকো পার্ক (Sitakunda Eco Park) চট্টগ্রাম শহর থেকে মাত্র ৩৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত। যা বর্তমানে অসাধারণ এক পর্যটন স্থান হিসাবে বেবেচিত হচ্ছে। এখানে সহস্র ধারা এবং সুপ্তধারা নামে দুইটি অনিন্দ্য সুন্দর ঝর্ণা রয়েছে। এছাড়া সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে রয়েছে অসংখ্য দুর্লভ প্রজাতির গাছ যা বৃক্ষ বিষয়ক জ্ঞান বৃদ্ধিতে সহায়ক। বোটানিক্যাল গার্ডেনে রয়েছে অর্কিড হাউস, যেখানে প্রায় ৫০ ধরনের দেশী-বিদেশী বিভিন্ন প্রজাতির অর্কিড সংরক্ষিত রয়েছে।

পাহাড়, বৃক্ষরাজি, বন্যপ্রাণী, ঝর্ণা, পাখির কলরব ইকো পার্কটিকে আরো সমৃদ্ধ করেছে। উঁচুনিচু পাহাড়, বানর, খরগোশ এবং হনুমান সহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণীর সমাহার, আছে অর্জুন, চাপালিশ, জারুল, তুন, তেলসুর, চুন্দুল সহ আরও অনেক ফুল, ফল ওষধি গাছ। সূর্য ডোবার সময় গোধূলীর রক্তিম আভায় ইকোপার্কটিকে অপার্থিব মনে হয়। ইকো পার্কে প্রবেশ করলে একটি বড় ডিসপ্লে চোখে পড়ে, এই ডিসপ্লেতে ইকোপার্কে আসা সমস্ত পর্যটকদের ইকো পার্ক সম্পর্কে ধারনা দেয়া আছে। সিএনজি সহ ইকো পার্কে প্রবেশ করতে ৮০/- টাকা লাগে। আর সিএনজি ছাড়া প্রবেশ করলে লাগে ২০ টাকা। সীতাকুণ্ড ইকো পার্কে চাইলে পিকনিক করতে পারবেন। এখানে পর্যাপ্ত খাবার পানি, রেষ্টহাউস, টয়লেট ইত্যাদির সুবিধাসহ পিকনিকের জন্য রয়েছে যাবতীয় আয়োজন।

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত

গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত (Guliakhali Sea Beach) চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলায় অবস্থিত। স্থানীয় মানুষের কাছে এই সৈকত মুরাদপুর বীচ নামেও সুপরিচিত। সীতাকুণ্ড বাজার থেকে গুলিয়াখালি সি বীচের দূরত্ব মাত্র কিলোমিটার। অনিন্দ্য সুন্দর গুলিয়াখালি সী বিচ কে সাজাতে প্রকৃতি কোন কার্পন্য করেনি। একদিকে দিগন্তজোড়া সাগর জলরাশি আর অন্য দিকে কেওড়া বন এই সাগর সৈকতকে করেছে অনন্য। কেওড়া বনের মাঝ দিয়ে বয়ে যাওয়া খালের চারিদিকে কেওড়া গাছের শ্বাসমূল লক্ষ করা যায়, এই বন সমুদ্রের অনেকটা ভেতর পর্যন্ত চলে গেছে। এখানে পাওয়া যাবে সোয়াম্প ফরেস্ট ম্যানগ্রোভ বনের মত পরিবেশ। গুলিয়াখালি সৈকতকে ভিন্নতা দিয়েছে সবুজ গালিচার বিস্তৃত ঘাস। সাগরের পাশে সবুজ ঘাসের উন্মুক্ত প্রান্তর নিশ্চিতভাবেই আপনার চোখ জুড়াবে। বীচের পাশে সবুজ ঘাসের এই মাঠে প্রাকৃতিক ভাবেই জেগে উঠেছে আঁকা বাঁকা নালা। এইসব নালায় জোয়ারের সময় পানি ভরে উঠে। চারপাশে সবুজ ঘাস আর তারই মধ্যে ছোট ছোট নালায় পানি পূর্ণ এই দৃশ্য যে কাউকে মুগ্ধ করবে। অল্প পরিচিত এই সৈকতে মানুষজনের আনাগোনা কম বলে আপনি পাবেন নিরবিলি পরিবেশ। সাগরের এত ঢেউ বা গর্জন না থাকলেও এই নিরবিলি পরিবেশের গুলিয়াখালি সমুদ্র সৈকত আপনার কাছে ধরা দিবে ভিন্ন ভাবেই। চাইলে জেলেদের বোটে সমুদ্রে ঘুরে আসতে পারেন। এক্ষেত্রে বোট ঠিক করতে দরদাম করে করে নিতে হবে।

সীতাকুণ্ডের খুব কাছে হওয়ায়, গুলিয়াখালী সমুদ্র সৈকত যাওয়া আসা দেখার পরেও হাতে থাকবে অনেকটুকু যময়।

কুমারীকুন্ড

চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুন্ড সবুজ পাহাড়ে ঘেরা এক পৌরাণিক অঞ্চলের নাম। পাহাড়ের খাঁজে খাঁজে লুকিয়ে রয়েছে প্রকৃতির অন্যোন্য বিস্ময় ছোট বড় অসংখ্য ছড়া ঝর্ণা। পাহাড়ের রহস্যময় আবহে পূর্ণ তেমনি এক ছড়ায় প্রাচীন এক মন্দিরের ধ্বংসাবশেষের সন্ধান পাওয়া যায়, যা কুমারীকুন্ড (Kumarikundo) নামে পরিচিত। প্রাচীনকালে হিন্দুরা উষ্ণ প্রস্রবণ বা হট স্প্রিং-কে খুবই পবিত্র মনে করতেন। সীতাকুন্ডে অবস্থিত লবণাক্ষকুন্ড অগ্নিকুন্ডের মত বুদবুদ আকারে নির্গত গ্যাসে জালানো অগ্নিকুন্ডকে ঘিরে নির্মিত মন্দিরের সাথে কুমারীকুন্ডের মিল রয়েছে। কালের আবহে মূল তীর্থ স্থান প্রায় ১০ কিলোমিটার সরে গেছে। আর মাটি চাপা পড়ে গেছে পুরনো ইটের তৈরী বিভিন্ন কাঠামো।

কুমারীকুন্ডকে পাথর দিয়ে বাঁধানো -১০ ফুট গভীর স্বচ্ছ নীল পানির কূপ বা চৌবাচ্চা বলা যায়। পরিষ্কার নীল পানির নীচ থেকে অনবরত নির্গত হচ্ছে গ্যাসের বুদবুদ। আর অদ্ভুদ আকারের সব পাথর মন্দিরের চারপাশের দেয়ালের জায়গা দখল করে নিয়েছে। সময়ের গহীনে লোকচক্ষুর আড়ালে হারিয়ে যাওয়া কুমারীকুন্ড বর্তমানে অ্যাডভ্যাঞ্চার প্রিয় পর্যটকদের নিকট এক আকর্ষণীয় স্থান।

বাওয়াছড়া লেক

চট্টগ্রাম জেলার মিরসরাই উপজেলার ওয়াহেদপুর গ্রামে ছোট কমলদহ বাজারের কাছে বাওয়াছড়া লেক (Bawachhora Lake and Waterfalls) অবস্থিত। ছোট কমলদহ বাজার থেকে লেকে দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার। বারমাসি ছড়ার নিকট অবস্থানের কারণে লেকটিকে বাওয়াছড়া লেক নামে ডাকা হয়। লেকের চারপাশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অত্যন্ত মনোমুগ্ধ, যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা কোন নিখুঁত ছবি।

ঝর্ণার পানি আছড়ে পড়ার শব্দ এখানে নূপুরধ্বনির মতই মধুর। দুইপাশের সুউচ্চ পাহাড় থেকে পানির অবিরাম লেকে গড়িয়ে পড়ার দৃশ্য অপূর্ব প্রশান্তি এনে দেয়। সেই সাথে পাহাড়ি সবুজের ফাঁকে পাখির কলতান মন কেড়ে নেয়। পর্যটকেরা তাই বাওয়াছড়া লেকের জলে নাগরিক জীবনের ক্লান্তি ভাসিয়ে দিতে মোটেও ভুল করেন না। এছাড়া ভরা পূর্ণিমা রাতে বাওয়াছড়া লেক হতে পাড়ে ক্যাম্পিংয়ের জন্য আদর্শ জায়গা।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

বাংলাদেশের বাণিজ্যিক রাজধানী চট্টগ্রাম জেলার হাটহাজারী উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের জঙ্গল পশ্চিম-পট্টি মৌজায় ১৯৬৬ সালে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (University of Chittagong) প্রতিষ্ঠিত হয়। শহরের কোলাহল আর যান্ত্রিকতা থেকে দূরে সবুজ পাহাড়ে ঘেরা নৈসর্গিক প্রকৃতির চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যেন শিক্ষার্থীদের জ্ঞানের তীর্থক্ষেত্রের পাশাপাশি জীববৈচিত্রের এক সমৃদ্ধ লাইব্রেরী। বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মোট জমির পরিমাণ ১৭৫৪ একর। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের ১০টি অনুষদের অধীনে ৫৪টি বিভাগে সর্বমোট ২৭৮৩৯ জনের অধিক শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত আছে। বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত শিক্ষকের সংখ্যা ৮৭২ জন।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে ঝুলন্ত সেতু, ১২টি আবাসিক হল, . লক্ষ বইয়ের সুবিশাল গ্রন্থাগার, মসজিদ, ক্যাফেটেরিয়া, জিমনেশিয়াম, মেডিকেল সেন্টার, শহীদ মিনার সহ বিভিন্ন নান্দ্যনিক স্মৃতিস্তম্ভ ভাস্কর্য, ৩টি পৃথক জাদুঘর এবং পাহাড়ি ঝর্ণা। আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের যাতায়াতের সুবিধার জন্য আছে দুইটি শাটল ট্রেন। শাটল ট্রেনে প্রতিদিন প্রায় দশ হাজার শিক্ষার্থী বিনামূল্যে চলাচল করে।

বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত

কক্সবাজার, পতেঙ্গা কিংবা কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকত ছাড়াও বাংলাদেশে বেশ কয়েকটি স্বল্প পরিচিত সমুদ্র সৈকত রয়েছে। চট্টগ্রাম জেলা শহর থেকে ৪০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত (Banshkhali Sea Beach) তেমনি এক অপ্রচলিত ভ্রমণ গন্তব্য। বালুময় বেলাভূমি ঝাউবনে ঘেরা বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত কক্সবাজারের পর বাংলাদেশের ২য় বৃহত্তম সমুদ্র সৈকত। এটি ছনুয়া, গন্ডামারা, সরল, বাহারছড়া, খানখানাবাদ উপকূল মিলিয়ে সর্বমোট ৩৭ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বিস্তৃত।

বাঁশখালী সমুদ্র সৈকত নির্জনতা প্রেমীদের জন্য এক আদর্শ জায়গা। দিগন্ত বিস্তৃত সাগরের বুকে সূর্যাস্তের দৃশ্য, লাল কাঁকড়ার অবাধ বিচরণ কিংবা দলবেঁধে বীচ ফুটবলে মেতে উঠার আনন্দ ভ্রমণকারীদের দেয় এক অপার্থিব পূর্ণতা। নির্জন এই সাগর সৈকতে নিরাপত্তার অভাব নেই মোটেও। বাঁশখালির কাছেই রয়েছে আরও এক আকর্ষণীয় ভ্রমণ গন্তব্য কুতুবদিয়া দ্বীপ।

প্রজাপতি পার্ক

চট্টগ্রাম জেলার শাহ আমানত বিমানবন্দর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত সংলগ্ন পতেঙ্গা নেভাল একাডেমির ১৫ নম্বর রোডে প্রায় একর জায়গা জুড়ে দেশের প্রথম প্রজাপতি পার্ক (Butterfly Park Bangladesh) গড়ে তোলা হয়েছে। ২০০৯ সালে স্থাপন করা হলেও ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে প্রজাপতি পার্ক আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে। এই পার্কে প্রায় ২০০ প্রজাতির এক হাজারেরও বেশি প্রজাপতি রয়েছে। এছাড়া এখানে বিশেষজ্ঞদের মাধ্যমে কৃত্রিম প্রজনন করানো হয়। মার্চ থেকে আগস্ট/সেপ্টেম্বর মাস প্রজাপতির স্বাভাবিক প্রজননের সময়।

প্রজাপতি পার্কের সামনে বিশালাকার প্রজাপতির ছবি দেখে পার্কের বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। পার্কে প্রবেশ পথের পরেই আছে কৃত্রিম ঝর্ণা বাটারফ্লাই জোন। অসংখ্য রঙিন প্রজাপতির আবার বাটারফ্লাই জোন পেরিয়ে সামনে এগিয়ে গেলেই আছে বাটারফ্লাই মিউজিয়াম। এখানে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন ধরণের প্রজাপতি বিশেষভাবে প্রদর্শনের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে। প্রজাপতির জাদুঘরের সামনে আছে শিশুদের খেলাধূলার জন্য কিছু আকর্ষণীয় রাইড। আর পার্কের জলাশয়ে আছে সাম্পান নৌকায় ভ্রমণের সুবিধা। প্রজাপতি উদ্যানে বনভোজন আয়োজনের সুব্যবস্থা রয়েছে, এছাড়া বিভিন্ন ধরণের অনুষ্ঠান আয়োজনের জন্য আছে কনফারেন্স রুম। আরো আছে আধুনিক রেস্ট হাউস এবং রেস্টুরেন্ট সুবিধা।

বাঁশখালী ইকোপার্ক

চট্টগ্রাম জেলার বাঁশখালী উপজেলায় মনোরম প্রাকৃতিক পরিবেশে উঁচু-নিচু পাহাড়, লেকের স্বচ্ছ পানি বনাঞ্চল ঘিরে গড়ে উঠেছে বাঁশখালী ইকোপার্ক (Banshkhali Eco Park) ২০০৩ সালে জীববৈচিত্র্য রক্ষা, বন্য প্রাণীর আবাস্থল উন্নয়ন, ইকো ট্যুরিজম চিত্তবিনোদনের উদ্দেশ্যে প্রায় ,০০০ হেক্টর বনভূমি নিয়ে চট্টগ্রাম শহর থেকে ৫৫ কিলোমিটার দূরে সরকারী উদ্যোগে বাঁশখালী ইকোপার্ক নির্মাণ করা হয়। ১৯৮৬ সালে প্রায় ,৭৬৪ হেক্টর বনভূমি নিয়ে চুনতি অভয়ারণ্য গড়ে তোলার ঘোষণা দিলে বাঁশখালীর বামের ছড়া ডানের ছড়া এই অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত করা হয়।

প্রকৃতির ভিন্ন ভিন্ন ঋতু বৈচিত্রের সাথে বাঁশখালী ইকোপার্কের সৌন্দর্যও পরিবর্তিত হতে থাকে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যমণ্ডিত পার্কের ৬৭৪ হেক্টর বনভূমিতে ঝাউ বাগান, ভেষজ উদ্ভিদের বন অর্নামেন্টাল গাছ সহ প্রায় ৩১০ প্রজাতির উদ্ভিদ রয়েছে। পার্কের উল্লেখযোগ্য স্থাপনার মধ্যে রয়েছে পিকনিক স্পট, দ্বিতল রেস্ট হাউজ, হিলটপ কটেজ, রিফ্রেশমেন্ট কর্ণার, দীর্ঘতম ঝুলন্ত ব্রিজ, ওয়াচ টাওয়ার এবং মিনি চিড়িয়াখানা। পার্কের দুইটি সুবিশাল লেকে রয়েছে মাছ ধরার যাবতীয় সুব্যবস্থা। ২০১১ সালের ২১ আগস্ট বাঁশখালী ইকোপার্কে বন্যপ্রাণী উদ্ভিদের তথ্য সম্বেলিত একটি তথ্য শিক্ষা কেন্দ্র নির্মাণ করা হয়।

সোনাইছড়ি ট্রেইল

চট্টগ্রামের বারৈয়াঢালা অভয়ারণ্যের অন্তর্ভুক্ত মীরসরাইয়ের হাদি ফকিরহাট বাজার সংলগ্ন সোনাইছড়ি ট্রেইল (Sonaichhari Trail) ডে ট্রিপের জন্য একটি আদর্শ জায়গা। চট্টগ্রামের সবচেয়ে সুন্দর সোনাইছড়ি ট্রেইলের বৈচিত্র্যময় বুনো পাথুরে সৌন্দর্য অ্যাডভেঞ্চার প্রেমীদের অদ্ভুত মায়ায় আকর্ষণ করে।

পিচ্ছিল ঝিরিপথ, খাড়া পাহাড় বাদুইজ্জাখুম পার হয়ে যাওয়ার সময় যে রোমাঞ্চকর অনুভূতির সৃষ্টি হয় সেই অভিজ্ঞতা সারাজীবনের এক অনন্য সঞ্চয়। বাদুইজ্জাকুমের দুইপাশের ১০০-১৫০ ফুট উঁচু খাড়া পাথুরে দেয়ালের অন্ধকারে হাজার হাজার বাঁদুরের ডানা ঝাপটানো শব্দ ভুতুড়ে পরিবেশের সৃষ্টি করে। আর ২৮ কিলোমিটার ট্রেইলের শেষ প্রান্তে পৌঁছালে অপূর্ব সোনাইছড়ি ঝর্ণা নিমিষেই সমস্ত ক্লান্তি দূর করে দেয়। তবে এই সোনাইছড়ি ট্রেকিং ট্রেইলে যেতে হলে দলগত ভাবে যাওয়া উচিত এবং ট্রেকিং এর পূর্ব অভিজ্ঞতা থাকলে সুবিধা হবে। বর্ষাকালে ফ্লাশ ফ্লাডের আশংখা থাকে। তাই বর্ষাকালে যাবার ক্ষেত্রে সতর্কতা মেনে চলা উচিত।

ফয়েজ লেক

ফয়েজ লেক (Foys Lake) একটি কৃত্রিম হ্রদ। চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে স্টেশন সংলগ্ন খুলশি এলাকায় প্রায় ৩৩৬ একর জায়গা জুড়ে ফয়েজ লেকের অবস্থান। চট্টগ্রামের জিরো পয়েন্ট থেকে এই লেকের দূরত্ব মাত্র কিলোমিটার। ১৯২৪ সালে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে কতৃপক্ষ এই লেকটি খনন করেন। তৎকালীন সময়ে লেকটি পাহারতলী লেক নামে পরিচিতি পেলেও পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রকৌশলীর নামানুসারে লেকটির নামকরণ করা হয় ফয়েজ লেক। আর এই ব্রিটিশ প্রকৌশলী ফয়েজ লেকের নকশা তৈরি করেছিলেন।

চারিদিকে ছোটবড় পাহাড় ঘেরা ফয়েস লেকের কাছে আছে চট্টগ্রাম শহরের সবচেয়ে উঁচু পাহাড় বাটালি হিল। এছাড়া এখানে গোধূলী, অরুনাময়ী, মন্দাকিনী, আকাশমনি, অলকানন্দা এবং দক্ষিনী নামের হৃদ রয়েছে। আর হ্রদের পানির শোভা বাড়িয়েছে সারি সারি ভাসমান নৌকা।২০০৫ সালে ফয় লেকে একটি আধুনিক অ্যামিউজমেন্ট পার্ক এবং বেশকিছু রিসোর্ট তৈরি করা হয়েছে। ফয় লেক অ্যামিউজমেন্ট পার্কে রয়েছে মিনি চিড়িয়াখানা, সার্কাস সুইং, রোলার কোষ্টার, বাম্পার কার, জায়ান্ট ফেরিস হুইল, ড্রাই স্লাইড, ফ্যামিলি ট্রেন, প্যাডেল বোট, ফ্লোটিং ওয়াটার প্লে, পাইরেট শিপ, বোট রাইডিং, ল্যান্ডস্কেপিং সহ বেশকিছু আকর্ষনীয় রাইড। আরও আছে পিকনিক স্পট, পর্যবেক্ষণ টাওয়ার এবং সী ওয়ার্ল্ড নামের একটি ওয়াটার থিম পার্ক। যেখানে সী ওয়ার্ল্ডে স্প্লাশ পুল, ওয়াটার কোষ্টার রাইডারসহ আরো কিছু রোমাঞ্চকর রাইড উপভোগ করার সুযোগ রয়েছে। ফয়েজ লেকের অপূর্ব প্রাকৃতিক পরিবেশের আহ্বানে প্রতি বছর অসংখ্য পর্যটক এখানে ছুটে আসেন।

 

খেজুরতলা বীচ

চট্রগ্রামের সাগর সৈকত গুলোর মধ্যে খেজুরতলা বীচ (Khejurtala Sea Beach) সৌন্দর্য্যপ্রেমী মানুষের কাছে ক্রমেই আগ্রহের অন্যতম কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হচ্ছে। আর খেজুরতলা বীচের রুপের যথার্থতা বুঝতে হলে ভোর কিংবা বিকেল বেলা খেজুরতলা বীচে যেতে হবে। নেভাল পরিবেশ, জেলেদের কর্ম ব্যস্ততা কিংবা সবুজ ঘাসের চাদরে মোড়ানো বাধ ধরে হাটতে হাটতে খেজুরতলা বীচের বৈচিত্রতা দেখে কাটিয়ে দিতে পারবেন একটি অপূর্ব বিকেল।

এছাড়াও সাগর পাড়ের জেলেদের সংগ্রামী জীবন কাছ থেকে দেখতে চলে যেতে পারেন খেজুরতলা বীচের দক্ষিণে অবস্থিত জাইল্লাপাড়া বীচে। ভোরে জেলে পাড়ায় গেলে বাড়তি পাওনা হিসাবে কিনে আনতে পারবেন তাজা ইলিশ কিংবা বিভিন্ন সামুদ্রিক মাছ।

সন্দ্বীপ

সন্দ্বীপ (Sandwip) বঙ্গোপসাগরের দক্ষিণ-পূর্ব উপকূলে চট্টগ্রাম জেলার মেঘনা নদীর মোহনায় অবস্থিত দ্বীপ উপজেলা। প্রায় লাখ জনসংখ্যার এই দ্বীপ ৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ -১৫ কিলোমিটার প্রশস্ত। অবারিত সবুজ মাঠ, নদীর বুকে জেগে উঠা চর কিংবা সহজ সরল মানুষ এক কথায় এই দ্বীপের সবকিছুই ভালো লাগার মত। এছাড়াও দ্বীপে দেখার মত ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন স্থান রয়েছে। সাগর নদী পরিবেষ্টিত এই দ্বীপে ভ্রমণ সারা জীবন মনে রাখার মত। আর শীতের সময় ক্যাম্পিং করার জন্যে সন্দ্বীপের পশ্চিম দিকে (রহমতপুর) নদী পাড় হচ্ছে আদর্শ জায়গা। এখানকার চারপাশ আপনাকে মুগ্ধ করবেই।

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

Comments